স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন থাকা খুবই জরুরি, কারণ এটি হঠাৎ করে জীবন বদলে দিতে পারে। ছবিটিতে “BE FAST” শব্দটি ব্যবহার করে স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার সহজ উপায় দেখানো হয়েছে। “BE FAST” আসলে একটি সচেতনতা বার্তা, যা স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলো দ্রুত চিনতে সাহায্য করে। যত দ্রুত রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, তত বেশি জীবন বাঁচানোর এবং স্থায়ী ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।স্ট্রোক কীস্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সাধারণত দুই ধরনের স্ট্রোক দেখা যায়।১. ইস্কেমিক স্ট্রোক – রক্তনালী ব্লক হয়ে গেলে হয়।২. হেমোরেজিক স্ট্রোক – মস্তিষ্কে রক্তনালী ফেটে গেলে হয়।স্ট্রোক খুব দ্রুত মারাত্মক আকার নিতে পারে। তাই এর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এখন “BE FAST” এর প্রতিটি অক্ষরের মানে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।B = Balanceহঠাৎ করে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা বা দাঁড়িয়ে থাকতে সমস্যা হওয়া। রোগী হাঁটার সময় টলতে পারে বা মাথা ঘুরতে পারে। অনেক সময় ব্যক্তি বুঝতেই পারে না কেন হঠাৎ সে ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। এটি স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।E = Eyesহঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা হওয়া। এক চোখ বা দুই চোখে ঝাপসা দেখা, ডাবল দেখা বা পুরোপুরি দেখতে না পারা হতে পারে। অনেকে ভাবেন এটি সাময়িক চোখের সমস্যা, কিন্তু এটি স্ট্রোকের সংকেতও হতে পারে।F = Faceমুখ বেঁকে যাওয়া বা মুখের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া। রোগীকে হাসতে বললে দেখা যায় মুখের এক দিক ঠিকভাবে নড়ছে না। এটি স্ট্রোকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ।A = Armsহাত দুর্বল হয়ে যাওয়া বা অবশ লাগা। সাধারণত শরীরের এক পাশ বেশি আক্রান্ত হয়। রোগীকে দুই হাত তুলতে বললে একটি হাত নিচে নেমে যেতে পারে বা তুলতেই পারে না।S = Speechকথা বলতে সমস্যা হওয়া। জড়িয়ে কথা বলা, অস্পষ্ট শব্দ বের হওয়া বা অন্যের কথা বুঝতে না পারা দেখা দিতে পারে। কখনও রোগী সহজ বাক্যও ঠিকভাবে বলতে পারে না।T = Timeসময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, মস্তিষ্কের ক্ষতি তত কম হবে।স্ট্রোকের আরও কিছু লক্ষণ• হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা• শরীরের এক পাশে অবশভাব• বিভ্রান্তি• অজ্ঞান হয়ে যাওয়া• গিলতে অসুবিধা• হঠাৎ দুর্বল লাগাস্ট্রোক কেন হয়স্ট্রোকের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কিছু প্রধান ঝুঁকির কারণ হলো—উচ্চ রক্তচাপএটি স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালীর ক্ষতি করে।ডায়াবেটিসরক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালীকে দুর্বল করে দেয়।ধূমপানধূমপান রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায় এবং রক্তনালী সংকুচিত করে।অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারখারাপ কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে রক্তনালী ব্লক হতে পারে।অতিরিক্ত ওজন ও অলস জীবনযাপনব্যায়ামের অভাব হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।মানসিক চাপদীর্ঘদিন অতিরিক্ত স্ট্রেস শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।অতিরিক্ত মদ্যপানএটি রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।স্ট্রোক হলে কী করতে হবে১. রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।২. রোগীকে শুইয়ে রাখতে হবে।৩. খাওয়ানো বা পানি দেওয়ার আগে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ গিলতে সমস্যা হতে পারে।৪. সময় নষ্ট করা যাবে না।৫. লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে তা মনে রাখা জরুরি, কারণ চিকিৎসকের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়• নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা• ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা• ধূমপান ছেড়ে দেওয়া• নিয়মিত ব্যায়াম করা• স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া• পর্যাপ্ত ঘুমানো• অতিরিক্ত তেল-চর্বি কম খাওয়া• মানসিক চাপ কমানোস্ট্রোকের চিকিৎসাস্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হয়। ইস্কেমিক স্ট্রোকে রক্ত জমাট ভাঙার ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিতে হয়। হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কখনও অপারেশন দরকার হতে পারে।চিকিৎসার পর ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও পুনর্বাসন খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোগী সঠিক থেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।সচেতনতার গুরুত্বঅনেক সময় মানুষ স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে পারেন না। ফলে হাসপাতালে যেতে দেরি হয়। এই কারণেই “BE FAST” বার্তাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাধারণ মানুষকে দ্রুত লক্ষণ চেনাতে সাহায্য করে।পরিবারের সবাইকে এই লক্ষণগুলো জানা উচিত, বিশেষ করে যাদের বাড়িতে বয়স্ক মানুষ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রোগী আছেন। কারণ দ্রুত পদক্ষেপ জীবন বাঁচাতে পারে।উপসংহারস্ট্রোক একটি গুরুতর কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। “BE FAST” মনে রাখলে স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চেনা যায় এবং রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে।