সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধে HPV টিকা: কেন

Spread the love

জরুরিসার্ভিকাল ক্যান্সার বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ও মারাত্মক ক্যান্সার। প্রতি বছর পৃথিবীর বহু নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। কিন্তু সুখবর হলো, এই ক্যান্সারের একটি বড় কারণকে আগে থেকেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর সেই প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো HPV টিকা।HPV-এর পূর্ণরূপ Human Papillomavirus। এটি এক ধরনের ভাইরাস যা সাধারণত ত্বক ও যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। HPV-এর অনেক ধরনের ভাইরাস আছে। এর মধ্যে কিছু ভাইরাস জরায়ুমুখের ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, পায়ুপথের ক্যান্সার এবং যৌনাঙ্গে আঁচিলের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে HPV টাইপ ১৬ ও ১৮ অধিকাংশ সার্ভিকাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী।সার্ভিকাল ক্যান্সার কী?নারীদের জরায়ুর নিচের অংশকে জরায়ুমুখ বা Cervix বলা হয়। এই অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি পেয়ে যখন ক্যান্সারে রূপ নেয় তখন তাকে সার্ভিকাল ক্যান্সার বলা হয়। এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং শুরুতে তেমন লক্ষণ দেখা যায় না। তাই অনেক সময় রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে যায়।সার্ভিকাল ক্যান্সারের লক্ষণপ্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত লক্ষণ থাকে না। তবে রোগ বাড়লে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন:মাসিকের বাইরে রক্তপাতসহবাসের পর রক্তপাতদুর্গন্ধযুক্ত স্রাবতলপেটে ব্যথাদুর্বলতা ও ওজন কমে যাওয়াএই ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।HPV কীভাবে ছড়ায়?HPV সাধারণত যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না যে তিনি ভাইরাস বহন করছেন। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে HPV-এর কোনো লক্ষণ থাকে না। একজন ব্যক্তি জীবনের কোনো না কোনো সময়ে HPV-তে আক্রান্ত হতে পারেন।তবে সব HPV সংক্রমণ ক্যান্সার সৃষ্টি করে না। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক সময় ভাইরাসকে নিজে থেকেই দূর করে দেয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস দীর্ঘদিন শরীরে থাকলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।HPV টিকা কী?HPV টিকা শরীরকে HPV ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই টিকা নেওয়ার ফলে ভাইরাসের ক্ষতিকর ধরনগুলো থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় এবং সার্ভিকাল ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।বর্তমানে ব্যবহৃত HPV টিকাগুলো নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। WHO বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই টিকার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে।কখন HPV টিকা নেওয়া উচিত?সাধারণত ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের HPV টিকা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। কারণ এই সময়ে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালোভাবে কাজ করে এবং ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সুরক্ষা তৈরি হয়।অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়স পর্যন্তও টিকা নেওয়া যায়। কিছু দেশে আরও বেশি বয়সেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই টিকা দেওয়া হয়।কত ডোজ টিকা লাগে?বয়স অনুযায়ী ডোজের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।৯–১৪ বছর: সাধারণত ২ ডোজ১৫ বছর বা তার বেশি: সাধারণত ৩ ডোজডোজের সময়সূচি চিকিৎসক ঠিক করে দেন।HPV টিকার উপকারিতা১. সার্ভিকাল ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়এটি টিকার সবচেয়ে বড় উপকারিতা। HPV টিকা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।২. যৌনাঙ্গে আঁচিল প্রতিরোধ করেকিছু HPV ভাইরাস যৌনাঙ্গে আঁচিল তৈরি করে। টিকা এই সমস্যাও কমাতে সাহায্য করে।৩. অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়মুখ, গলা, পায়ুপথসহ কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমতে পারে।৪. দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়গবেষণায় দেখা গেছে HPV টিকা বহু বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে।HPV টিকা কি নিরাপদ?হ্যাঁ, HPV টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এই টিকা নিয়েছেন। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, সামান্য জ্বর বা দুর্বলতা হতে পারে। এগুলো সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়।গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই বিরল। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।টিকা নিলেও কি পরীক্ষা দরকার?হ্যাঁ। HPV টিকা নেওয়ার পরেও নিয়মিত সার্ভিকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিকা সব ধরনের HPV থেকে শতভাগ সুরক্ষা দেয় না।Pap smear বা HPV test-এর মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় অস্বাভাবিক কোষ ধরা সম্ভব। এতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়।সচেতনতার গুরুত্বআমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ HPV টিকা সম্পর্কে জানেন না। অনেকে ভুল ধারণা বা লজ্জার কারণে টিকা নিতে চান না। কিন্তু সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি।মেয়েদের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষক ও সমাজেরও এই বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা দরকার। কারণ সময়মতো টিকা অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে।কিছু ভুল ধারণাভুল ধারণা ১: HPV টিকা দিলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে সমস্যা হয়।এটি সম্পূর্ণ ভুল। এই টিকার সঙ্গে বন্ধ্যাত্বের কোনো সম্পর্ক নেই।ভুল ধারণা ২: টিকা শুধু বিবাহিত নারীদের জন্য।আসলে কম বয়সে, বিশেষ করে যৌনজীবন শুরু হওয়ার আগেই টিকা সবচেয়ে কার্যকর।ভুল ধারণা ৩: টিকা নিলে আর ক্যান্সার হবে না।টিকা ঝুঁকি অনেক কমায়, কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষাসার্ভিকাল ক্যান্সার এমন একটি রোগ যা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা সম্ভব। HPV টিকা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সচেতন জীবনযাপন এই রোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সুরক্ষা দেয়।বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আমরা এমন একটি সুযোগ পেয়েছি যেখানে একটি টিকার মাধ্যমে ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি কমানো যায়। তাই সচেতন হওয়া এবং অন্যদের সচেতন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।উপসংহারHPV টিকা শুধু একটি ইনজেকশন নয়, এটি ভবিষ্যতের সুরক্ষা। সার্ভিকাল ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে এই টিকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টিকা নেওয়া, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করলে অনেক নারীকে এই রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।স্বাস্থ্য সচেতনতা মানেই সুস্থ ভবিষ্যৎ। তাই HPV টিকা সম্পর্কে জানুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতন থাকুন।

Leave a comment