কীভাবে ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারেন

Spread the love

ক্যান্সার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা। এটি এমন একটি রোগ যেখানে শরীরের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যান্সার একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের কিছু খারাপ অভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দূষণ, ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং জেনেটিক কারণ মিলেই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সুখবর হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সচেতন জীবনযাপন ও কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।১. ধূমপান ও তামাক থেকে দূরে থাকুনক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো তামাকজাত দ্রব্য। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুটখা, পানমশলা ইত্যাদি মুখ, গলা, ফুসফুস এবং খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু ধূমপায়ীই নয়, পাশের ধোঁয়াও অন্যদের জন্য ক্ষতিকর। একে বলা হয় “প্যাসিভ স্মোকিং”।যদি কেউ ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করেন, তাহলে ধীরে ধীরে তার শরীরের ক্ষতির পরিমাণ কমতে শুরু করে। তাই ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত তামাককে সম্পূর্ণভাবে না বলা।২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুনসঠিক খাদ্যাভ্যাস ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, আঁশযুক্ত খাবার এবং প্রোটিন রাখুন। এসব খাবারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা শরীরের ক্ষতিকর কোষের বিরুদ্ধে কাজ করে।অন্যদিকে অতিরিক্ত তেল, ভাজাপোড়া, প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন সসেজ, সালামি বা অতিরিক্ত ফাস্টফুড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। এটি শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে।৩. নিয়মিত শরীরচর্চা করুনশারীরিক পরিশ্রম কম হলে স্থূলতা বাড়ে এবং স্থূলতা অনেক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, ব্যায়াম, সাইকেল চালানো বা খেলাধুলা শরীরকে সুস্থ রাখে।নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে।৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুনঅতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শুধু ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ নয়, ক্যান্সারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে স্তন, কোলন ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াও অবহেলা করা উচিত নয়।৫. অ্যালকোহল বা মদ্যপান এড়িয়ে চলুনঅতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ মুখ, লিভার, খাদ্যনালী এবং স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা ভালো।৬. সূর্যের অতিরিক্ত রোদ থেকে ত্বককে রক্ষা করুনঅতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করে এবং স্কিন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। দুপুরের তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় থাকা এড়িয়ে চলা উচিত। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো।ত্বকে অস্বাভাবিক দাগ, তিলের রং পরিবর্তন বা ক্ষত দীর্ঘদিন না শুকালে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।৭. টিকা গ্রহণ করুনকিছু ভাইরাস ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন HPV ভাইরাস জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ হতে পারে এবং হেপাটাইটিস বি ভাইরাস লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।এই কারণে HPV ও হেপাটাইটিস বি টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কিশোরী মেয়েদের HPV টিকা ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।৮. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুনক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসার সফলতা অনেক বেশি। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।মহিলাদের স্তন পরীক্ষা ও প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট করা উচিত। পুরুষদেরও বয়স অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো দরকার। শরীরে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ যেমন দীর্ঘদিনের কাশি, অস্বাভাবিক রক্তপাত, ওজন কমে যাওয়া, গিলতে কষ্ট হওয়া বা দীর্ঘদিনের ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।৯. দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে সতর্ক থাকুনবায়ুদূষণ, কারখানার রাসায়নিক, কীটনাশক ও বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।যারা কারখানা বা রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে কাজ করেন, তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা জরুরি। ঘর ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা এবং বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।১০. মানসিক চাপ কমানঅতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। যদিও মানসিক চাপ সরাসরি ক্যান্সারের কারণ নয়, তবে এটি শরীরকে অসুস্থ করে তুলতে পারে।পর্যাপ্ত ঘুম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, ধ্যান, বই পড়া বা নিজের পছন্দের কাজ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।১১. পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্বপ্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। কম ঘুম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত।১২. সচেতনতা বাড়ানো জরুরিঅনেক মানুষ এখনও ক্যান্সার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানেন না। ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে। পরিবার, স্কুল, কলেজ ও সমাজে ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।সঠিক তথ্য জানলে মানুষ দ্রুত চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত হবে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করবে।উপসংহারক্যান্সার একটি ভয়ংকর রোগ হলেও সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ধূমপান ত্যাগ, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, টিকা নেওয়া এবং শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়া ক্যান্সার প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।মনে রাখতে হবে, “প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে ভালো।” আজকের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই নিজের সুস্থতার জন্য এখন থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুরু করা উচিত।

Leave a comment