বর্তমান সময়ে অসংখ্য মানুষ এমন অনেক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন যেগুলোর শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা, কিডনি রোগ, হৃদরোগ এমনকি কিছু ক্যান্সারও দীর্ঘ সময় নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে। তাই শুধুমাত্র অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোই যথেষ্ট নয়, বরং সুস্থ অবস্থায়ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা হেলথ স্ক্রিনিং করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, “হেলথ স্ক্রিনিং শুরু করব কখন? ২৫ বছর বয়সে, ৩৫-এ, নাকি ৪৫-এর পর?” এর উত্তর সবার জন্য এক নয়। একজন মানুষের জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাসের উপর নির্ভর করে কখন স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত। তবে কিছু সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে, যা জানা থাকলে সঠিক সময়ে পরীক্ষা শুরু করা সহজ হয়।হেলথ স্ক্রিনিং কী?হেলথ স্ক্রিনিং হলো এমন কিছু মেডিকেল পরীক্ষা যা শরীরে কোনো রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে রোগ দ্রুত ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা শুরু করা যায়। ফলে ভবিষ্যতে বড় জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়:ব্লাড প্রেসার পরীক্ষাব্লাড সুগার পরীক্ষাকোলেস্টেরল টেস্টলিভার ও কিডনি ফাংশন টেস্টথাইরয়েড পরীক্ষাক্যান্সার স্ক্রিনিংচোখ ও দাঁতের পরীক্ষাএসব পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো শরীরের বর্তমান অবস্থা বোঝা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো।২৫ বছর বয়সে স্ক্রিনিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?অনেকে মনে করেন কম বয়সে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবে এখনকার জীবনযাপন, অনিয়মিত খাবার, ফাস্টফুড, কম ঘুম, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং মানসিক চাপের কারণে অনেক রোগ অল্প বয়সেই দেখা দিচ্ছে।২৫ বছর বয়সে যেসব স্ক্রিনিং করা ভালো:রক্তচাপ পরীক্ষাBMI বা ওজন মূল্যায়নব্লাড সুগারকোলেস্টেরলচোখের পরীক্ষাদাঁতের পরীক্ষামানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নযদি পরিবারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকে, তাহলে ২৫ বছর থেকেই নিয়মিত পরীক্ষা শুরু করা উচিত।বিশেষ করে যারা:ধূমপান করেনঅতিরিক্ত ওজনেরব্যায়াম করেন নাদীর্ঘ সময় বসে কাজ করেনঅতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খানতাদের জন্য অল্প বয়স থেকেই স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি।৩৫ বছর: সতর্ক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়৩৫ বছর এমন একটি সময় যখন শরীরে ধীরে ধীরে মেটাবলিজম কমতে শুরু করে। অনেকের ওজন বাড়ে, রক্তচাপ বেড়ে যায়, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পায়। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সমস্যা তৈরি হতে পারে।এই বয়সে যেসব পরীক্ষা নিয়মিত করা উচিত:ফাস্টিং ব্লাড সুগারHbA1cলিপিড প্রোফাইললিভার ফাংশন টেস্টকিডনি ফাংশন টেস্টECGথাইরয়েড পরীক্ষাভিটামিন D ও B12নারীদের জন্য:প্যাপ স্মিয়ারস্তনের পরীক্ষাহরমোন মূল্যায়নপুরুষদের জন্য:প্রোস্টেট সংক্রান্ত প্রাথমিক মূল্যায়নএই সময়ে অনেকেই কাজের চাপ, দায়িত্ব এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। কিন্তু বাস্তবে ৩৫-এর পর থেকেই নিয়মিত চেকআপ ভবিষ্যতের বড় রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।৪৫ বছর: বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিংয়ের সময়৪৫ বছর পার হওয়ার পর শরীরে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই এই বয়সে নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।৪৫ বছর বা তার পরে যেসব স্ক্রিনিং জরুরি:সম্পূর্ণ হৃদরোগ মূল্যায়নইকোকার্ডিওগ্রামস্ট্রেস টেস্টকোলন ক্যান্সার স্ক্রিনিংচোখে গ্লুকোমা পরীক্ষাহাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষাকিডনি ও লিভারের বিস্তারিত পরীক্ষানারীদের জন্য:ম্যামোগ্রাফিমেনোপজ সম্পর্কিত পরীক্ষাপুরুষদের জন্য:PSA টেস্টপ্রোস্টেট পরীক্ষাএই বয়সে অনেক রোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। তাই “আমি তো ভালোই আছি” ভেবে পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।পরিবারে রোগের ইতিহাস থাকলে কী করবেন?যদি পরিবারে নিচের রোগগুলোর ইতিহাস থাকে:ডায়াবেটিসহৃদরোগস্ট্রোকক্যান্সারথাইরয়েড সমস্যাতাহলে সাধারণ মানুষের তুলনায় আরও আগে স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে ২০-২৫ বছর থেকেই নিয়মিত পরীক্ষা দরকার হতে পারে।কারণ জেনেটিক ঝুঁকি থাকলে রোগ দ্রুত দেখা দিতে পারে।শুধু বয়স নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণকেউ ২৫ বছর বয়সেই অসুস্থ হতে পারেন, আবার কেউ ৫০ বছরেও সুস্থ থাকতে পারেন। এর পেছনে জীবনযাপন বড় ভূমিকা রাখে।নিচের অভ্যাসগুলো থাকলে দ্রুত স্ক্রিনিং দরকার:ধূমপানমদ্যপানকম ঘুমমানসিক চাপস্থূলতাব্যায়ামের অভাবঅতিরিক্ত চিনি ও তেলযুক্ত খাবারবর্তমানে তরুণদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রিডায়াবেটিস খুব সাধারণ হয়ে উঠছে। তাই শুধু বয়স দেখে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না।কতদিন পরপর পরীক্ষা করা উচিত?সাধারণভাবে:২০-৩০ বছর: ২-৩ বছর অন্তর৩০-৪০ বছর: ১-২ বছর অন্তর৪০-এর পর: বছরে অন্তত একবারতবে কারো ঝুঁকি বেশি থাকলে ডাক্তার আরও ঘন ঘন পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।হেলথ স্ক্রিনিংয়ের উপকারিতানিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে:রোগ আগে ধরা পড়েচিকিৎসা সহজ হয়খরচ কমেবড় জটিলতা এড়ানো যায়জীবনযাত্রার মান ভালো থাকেদীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পাওয়া সম্ভব হয়অনেক সময় মানুষ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের শিকার হন, অথচ আগে কোনো লক্ষণই ছিল না। নিয়মিত স্ক্রিনিং থাকলে আগেই ঝুঁকি বোঝা যেত।অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কি ক্ষতিকর?হ্যাঁ, প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত পরীক্ষা করাও ঠিক নয়। ইন্টারনেট দেখে নিজে নিজে অনেক টেস্ট করানোর বদলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো উচিত।কারণ:অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়েভুল রিপোর্টে অযথা দুশ্চিন্তা হতে পারেকিছু পরীক্ষার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারেতাই বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ঝুঁকি অনুযায়ী পরিকল্পিত স্ক্রিনিং সবচেয়ে ভালো।উপসংহারহেলথ স্ক্রিনিং শুরু করার নির্দিষ্ট একটাই বয়স নেই। তবে সাধারণভাবে ২৫ বছর থেকে বেসিক পরীক্ষা শুরু করা ভালো, ৩৫-এর পর নিয়মিত স্ক্রিনিং খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ৪৫-এর পর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।স্বাস্থ্য পরীক্ষা মানে শুধু রোগ খোঁজা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। সুস্থ থাকতে চাইলে শরীরের ভেতরের অবস্থাও জানা দরকার। কারণ অনেক রোগ শুরুতে নীরব থাকে, কিন্তু সময়মতো ধরা পড়লে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।তাই “সময় হলে করব” ভাবার বদলে সঠিক সময়ে হেলথ স্ক্রিনিং শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।