হার্ট ভালো রাখতে কোন তেল ব্যবহার করবেন—প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর উত্তরটা একটু গভীরভাবে বোঝা দরকার। কারণ আমরা প্রতিদিন যে তেল ব্যবহার করি, সেটাই ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের ভেতরে প্রভাব ফেলে—বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের ওপর।প্রথমে একটা বেসিক জিনিস পরিষ্কার করি। সব তেল একরকম নয়। মূলত তিন ধরনের ফ্যাট থাকে—স্যাচুরেটেড ফ্যাট, আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (মনো ও পলি), এবং ট্রান্স ফ্যাট। এর মধ্যে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হার্টের জন্য ভালো, স্যাচুরেটেড ফ্যাট সীমিত পরিমাণে চলতে পারে, আর ট্রান্স ফ্যাট যতটা সম্ভব এড়ানো উচিত।এখন আসি কোন তেল ভালো।সবচেয়ে বেশি সুপারিশ করা হয় সরিষার তেল (Mustard oil)। আমাদের বাংলায় এটা খুবই কমন। এতে মনো ও পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভালো ব্যালান্স থাকে, সঙ্গে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও আছে। এগুলো হার্টের ব্লকেজ কমাতে সাহায্য করে এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে খেয়াল রাখতে হবে তেলটা যেন ভালো মানের এবং বেশি পোড়ানো না হয়।দ্বিতীয়ত, অলিভ অয়েল (Olive oil)। বিশেষ করে extra virgin olive oil হার্টের জন্য খুবই ভালো। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা “খারাপ” LDL কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। তবে এটা বেশি তাপে রান্নার জন্য সবসময় আদর্শ নয়, বরং সালাদ বা হালকা রান্নায় ব্যবহার করা ভালো।তৃতীয়ত, সানফ্লাওয়ার তেল (Sunflower oil) এবং সয়াবিন তেল। এগুলোতে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। এগুলো কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার করলে ওমেগা-৬ বেশি হয়ে যায়, যা আবার ইনফ্লামেশন বাড়াতে পারে। তাই এগুলো ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু ব্যালান্স রাখতে হবে।চতুর্থত, রাইস ব্র্যান অয়েল (Rice bran oil)। এটা এখন অনেকেই ব্যবহার করছেন। এতে oryzanol নামে একটি উপাদান থাকে, যা কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। হালকা, কম গন্ধ, এবং উচ্চ তাপে রান্নার জন্যও ভালো।এবার আসি কোন তেল এড়ানো উচিত।ডালডা বা ভ্যানাস্পতি, এবং যেকোনো ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত তেল একদমই এড়ানো উচিত। এগুলো সরাসরি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া বারবার একই তেল গরম করে ব্যবহার করাও খুব ক্ষতিকর। এতে ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি হয়, যা হার্টের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ক্ষতি করে।আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—একই তেল সবসময় ব্যবহার না করে রোটেশন রাখা ভালো। মানে কখনও সরিষার তেল, কখনও সানফ্লাওয়ার বা রাইস ব্র্যান। এতে ফ্যাটি অ্যাসিডের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়, যা শরীরের জন্য ভালো।তেলের পরিমাণও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো তেল হলেও বেশি খেলে লাভ নেই। সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে ৩–৪ চামচ তেল যথেষ্ট। এর বেশি হলে ওজন বাড়বে, কোলেস্টেরল বাড়বে, আর হার্টের ওপর চাপ পড়বে।এখন একটু বাস্তব কথা বলি। অনেকেই ভাবেন “আমি তো ভালো তেল ব্যবহার করছি, তাই সমস্যা হবে না।” কিন্তু আসল বিষয় হলো মোট লাইফস্টাইল। তেলের সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে দেখতে হবে—আপনি কি নিয়মিত ব্যায়াম করছেন?আপনার ডায়েটে কি বেশি ভাজাভুজি আছে?আপনি কি ধূমপান করেন?স্ট্রেস কতটা?এই সবকিছু মিলে হার্টের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে।রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। ডিপ ফ্রাইয়ের বদলে স্টিম, সেদ্ধ, গ্রিল বা হালকা ভাজা পদ্ধতি বেছে নিন। এতে তেলের ব্যবহার কম হবে এবং হার্টের ওপর চাপও কম পড়বে।শেষে সংক্ষেপে বলি—হার্ট ভালো রাখতে সরিষার তেল, অলিভ অয়েল, রাইস ব্র্যান অয়েল ভালো অপশন। সানফ্লাওয়ার বা সয়াবিন তেলও ব্যবহার করা যায়, তবে ব্যালান্স রেখে। ট্রান্স ফ্যাট একেবারে বাদ দিন, তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, আর লাইফস্টাইল ঠিক করুন।কারণ আসল সত্যটা হলো—শুধু তেল বদলালে হবে না, পুরো অভ্যাসটাই একটু বদলাতে হবে। তখনই আপনার হার্ট সত্যিকারের ভালো থাকবে।