হাঁট দাঁড়ালে মাথা ঘোরে?অবহেলা করবেন না!

Spread the love

হঠাৎ করে দাঁড়ানোর পর মাথা ঘোরা অনেকের কাছেই খুব সাধারণ একটি সমস্যা। কেউ বসে বা শুয়ে থাকার পর উঠে দাঁড়াতেই চোখে অন্ধকার দেখে, মাথা ঝিমঝিম করে, শরীর দুর্বল লাগে বা মনে হয় পড়ে যাবেন। অনেক সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঠিক হয়ে যায় বলে মানুষ এটাকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু বারবার এমন হলে এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই বিষয়টি বুঝে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া জরুরি।কেন দাঁড়ালে মাথা ঘোরে?আমাদের শরীরের রক্তচাপ ও রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্র একসঙ্গে কাজ করে। যখন আমরা শুয়ে বা বসে থাকি, তখন শরীরের রক্ত সহজে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। কিন্তু হঠাৎ দাঁড়ালে কিছু রক্ত নিচের দিকে নেমে যায়। তখন শরীর দ্রুত রক্তচাপ ঠিক করার চেষ্টা করে। যদি সেই সমন্বয় ঠিকমতো না হয়, তাহলে মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্ত কম পৌঁছায় এবং মাথা ঘোরে।চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে অনেক সময় “অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন” বলা হয়।সাধারণ লক্ষণগুলো কী?দাঁড়ানোর পর নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে:মাথা ঘোরাচোখে ঝাপসা দেখাশরীর দুর্বল লাগামাথা হালকা লাগাবমি বমি ভাবভারসাম্য হারানোঅতিরিক্ত ঘাম হওয়াঅজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতিকিছু মানুষের ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড়ও করতে পারে।এর প্রধান কারণগুলো১. শরীরে পানির অভাবকম পানি খেলে শরীরে ডিহাইড্রেশন হয়। এতে রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তচাপ হঠাৎ পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গরমে বেশি ঘাম হলে এই সমস্যা বাড়ে।২. দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকাখাবার না খেলে শরীরে গ্লুকোজ কমে যায়। এতে দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা হতে পারে। অনেকেই সকালে না খেয়ে কাজে বের হন, তখন সমস্যা বেশি দেখা দেয়।৩. রক্তচাপ কম থাকালো ব্লাড প্রেসারের কারণে দাঁড়ানোর সময় মাথা ঘুরতে পারে। কারও স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ কম থাকে, আবার কারও ওষুধের কারণে কমে যায়।৪. রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াশরীরে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। ফলে সহজেই মাথা ঘোরা ও ক্লান্তি আসে।৫. অতিরিক্ত মানসিক চাপদুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও ঘুমের অভাব শরীরের স্বাভাবিক স্নায়বিক কাজকে প্রভাবিত করে। এতে মাথা ঘোরা বাড়তে পারে।৬. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াউচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, ডিপ্রেশনের ওষুধ বা কিছু সিডেটিভ ওষুধ রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে।৭. হৃদরোগ বা স্নায়ুর সমস্যাকখনও কখনও হৃদপিণ্ড ঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে বা স্নায়ুর সমস্যা থাকলেও দাঁড়ানোর সময় মাথা ঘোরে।কারা বেশি ঝুঁকিতে?বয়স্ক মানুষডায়াবেটিস রোগীউচ্চ রক্তচাপের রোগীগর্ভবতী নারীদীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা ব্যক্তিযাদের শরীরে পানি কম থাকেযারা খুব কম খাওয়া-দাওয়া করেনকী করবেন?ধীরে ধীরে উঠুনশুয়ে থাকা থেকে একেবারে দ্রুত উঠে দাঁড়াবেন না। আগে বসুন, কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন, তারপর ধীরে দাঁড়ান।পর্যাপ্ত পানি পান করুনপ্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি খাওয়া খুব জরুরি। বিশেষ করে গরমের দিনে আরও বেশি পানি দরকার।নিয়মিত খাবার খানদীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকবেন না। পুষ্টিকর খাবার খান যাতে শরীর শক্তি পায়।পর্যাপ্ত ঘুমানঘুম কম হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মাথা ঘোরা বাড়তে পারে।অতিরিক্ত গরম এড়িয়ে চলুনগরমে দীর্ঘক্ষণ থাকলে শরীরে পানির ঘাটতি হয়। তাই রোদে কাজ করলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন।রক্তচাপ পরীক্ষা করুনযদি বারবার সমস্যা হয়, তাহলে ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করা দরকার।আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খানরক্তস্বল্পতা থাকলে পালং শাক, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল ও খেজুর খেতে পারেন।কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?নিচের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়াবুকব্যথাশ্বাসকষ্টকথা জড়িয়ে যাওয়াশরীর অবশ হওয়াতীব্র মাথাব্যথাদীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকাএগুলো গুরুতর রোগের লক্ষণও হতে পারে।ঘরোয়া কিছু সতর্কতাসকালে ঘুম থেকে উঠে ধীরে উঠুনহঠাৎ ঝুঁকে কাজ করবেন নাবেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলে মাঝে বসে বিশ্রাম নিনক্যাফেইন ও অ্যালকোহল কমানহালকা ব্যায়াম করুনশিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রেও কি হয়?হ্যাঁ, শুধু বয়স্কদের নয়, কিশোর-কিশোরীদেরও এই সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যারা কম পানি খায়, অনিয়মিত খাবার খায় বা দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ও কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে তাদের মধ্যে মাথা ঘোরা বেশি দেখা যায়।গর্ভাবস্থায় মাথা ঘোরাগর্ভাবস্থায় শরীরে রক্ত সঞ্চালনের পরিবর্তন হয়। ফলে অনেক নারীর দাঁড়ালে মাথা ঘোরে। তবে অতিরিক্ত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।প্রতিরোধের উপায়এই সমস্যা পুরোপুরি এড়ানো সবসময় সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।প্রতিদিন নিয়মিত পানি পান করুনসময়মতো খাবার খানব্যায়াম করুনপর্যাপ্ত বিশ্রাম নিনডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন নাউপসংহারদাঁড়ানোর সময় মাথা ঘোরা ছোটখাটো সমস্যা মনে হলেও কখনও এটি শরীরের বড় কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। যদি মাঝে মাঝে হয়, তাহলে জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনেই উপকার পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা বারবার হলে বা অন্য লক্ষণ যুক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Leave a comment